কার্তিক পূজা ও ব্রত: শাস্ত্রীয় মাহাত্ম্য এবং পালন পদ্ধতি

Polok
কার্তিক পূজা

ভূমিকা

হিন্দু পঞ্জিকার অন্যতম পবিত্র মাস কার্তিক। এই মাসটি ভক্তি, পূজা-অর্চনা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ বলে শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। স্কন্দপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণসহ বিভিন্ন পুরাণে কার্তিক মাসের মাহাত্ম্য বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। এই মাসে বিশেষ পূজা, ব্রত, দান এবং তীর্থস্নানের মাধ্যমে ভক্তগণ পুণ্য অর্জন করেন এবং জীবনে মঙ্গল লাভ করেন।

কার্তিক মাস শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে বিভিন্ন উৎসব, পূজা-পার্বণ এবং ব্রত পালন করা হয় যা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কার্তিক মাসের শাস্ত্রীয় মাহাত্ম্য

পুরাণোক্ত মাহাত্ম্য

পদ্মপুরাণে উল্লেখ আছে:

"কার্তিকে তু বিশেষেণ বিষ্ণুভক্তিপ্রদায়কঃ।
সর্বপাপহরো মাসঃ সর্বসম্পত্প্রদায়কঃ॥"

অর্থাৎ, কার্তিক মাস বিশেষভাবে বিষ্ণুভক্তি প্রদান করে, এই মাস সমস্ত পাপ হরণ করে এবং সর্বপ্রকার সম্পদ প্রদান করে।

স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে:

"মাসানাং কার্তিকো রাজা পুণ্যানাং শিরমৌলিকঃ।
দামোদরব্রতং কৃত্বা ব্রহ্মলোকং সমশ্নুতে॥"

অর্থাৎ, মাসগুলির মধ্যে কার্তিক রাজা এবং পুণ্যসমূহের শিরোমণি। দামোদর ব্রত পালন করে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হওয়া যায়।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে উল্লিখিত:

"কার্তিকস্য মহামাসে যঃ করোতি দিনে দিনে।
তুলসীদীপদানেন হরিপূজাং সমাহিতঃ॥
সর্বপাপবিনির্মুক্তো বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি।"

অর্থাৎ, যিনি কার্তিক মাসে প্রতিদিন একাগ্রচিত্তে তুলসীতে দীপদান ও হরিপূজা করেন, তিনি समस्त पाप से মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে গমন করেন।

কার্তিক মাসের নামকরণ

কার্তিক মাসের নামকরণ নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। কৃত্তিকা নক্ষত্রের সাথে পূর্ণিমা যুক্ত হওয়ায় এই মাসের নাম কার্তিক হয়েছে। আবার ভগবান শিব ও পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়ের (স্কন্দ) জন্মের সাথেও এই মাসের সম্পর্ক রয়েছে।

কার্তিক মাসের প্রধান পূজা ও ব্রত

১. দামোদর ব্রত

দামোদর ব্রত কার্তিক মাসের অন্যতম প্রধান ব্রত। এই ব্রত সমগ্র কার্তিক মাস জুড়ে পালন করা হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দামোদর রূপের পূজা এই ব্রতের মূল বিষয়।

পৌরাণিক কাহিনী:

একদা বালক কৃষ্ণ মা যশোদার অবাধ্য হয়ে মাখন চুরি করেন। ক্রোধান্বিত যশোদা কৃষ্ণকে উদুখলে (উড়ুল) বাঁধতে চেষ্টা করেন, কিন্তু রশি সবসময় ছোট পড়ে যায়। অবশেষে ভগবান কৃষ্ণ স্বেচ্ছায় নিজেকে বাঁধতে দেন। এই ঘটনার স্মরণে দামোদর ব্রত পালন করা হয়।

পূজা পদ্ধতি:

  • প্রতিদিন প্রাতঃকালে স্নান করে শুচি হতে হয়
  • তুলসী গাছের নিচে বা পূজাগৃহে দীপ জ্বালাতে হয়
  • ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের দামোদর মূর্তির পূজা করতে হয়
  • তুলসীপত্র, ফুল, ফল, মিষ্টান্ন নিবেদন করতে হয়
  • দামোদর স্তোত্র বা দামোদরাষ্টক পাঠ করতে হয়

দামোদরাষ্টকের একটি শ্লোক:

"নমামীশ্বরং সচ্চিদানন্দরূপং
লসত্কুণ্ডলং গোকুলে ভ্রাজমানম্।
যশোদাভিয়োলূখলাদ্ধাবমানং
পরামৃষ্টমত্যন্ততো দ্রুত্য গোপ্যা॥"

২. তুলসী পূজা ও বিবাহ

কার্তিক মাসে তুলসী পূজার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। কার্তিক শুক্লা একাদশীতে (দেবোত্থান একাদশী) তুলসী বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।

পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে:

"তুলসীদলমাত্রেণ জলস্য চুলুকেন চ।
বিক্রীণীতে স্বমাত্মানং ভক্তেভ্যো ভক্তবৎসলঃ॥"

অর্থাৎ, একটি মাত্র তুলসীপত্র এবং এক অঞ্জলি জল দ্বারা ভক্তবৎসল ভগবান নিজেকে ভক্তের কাছে বিক্রয় করেন।

তুলসী বিবাহের তাৎপর্য:

তুলসী বিবাহ ভগবান বিষ্ণু (শালগ্রাম বা কৃষ্ণমূর্তি) এবং তুলসী দেবীর মধ্যে সম্পন্ন হয়। এই বিবাহের মাধ্যমে বিবাহযোগ্য কন্যাদের বিবাহ প্রাপ্তি এবং দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি লাভের আশীর্বাদ পাওয়া যায়।

৩. অন্নকূট উৎসব

কার্তিক শুক্লা প্রতিপদে (দীপাবলির পরদিন) অন্নকূট উৎসব পালন করা হয়। এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ৫৬ প্রকার (ছাপ্পান ভোগ) খাদ্য নিবেদন করা হয়।

পৌরাণিক কাহিনী:

শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রদেবের অহংকার দমনের জন্য গোবর্ধন পর্বত উত্তোলন করে ব্রজবাসীদের রক্ষা করেছিলেন। এই ঘটনার স্মরণে গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট উৎসব পালন করা হয়।

৪. ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা

কার্তিক শুক্লা দ্বিতীয়াতে ভ्रাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা পালিত হয়। এই দিনে বোনেরা ভাইদের কপালে তিলক বা ফোঁটা দিয়ে তাদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন।

শাস্ত্রীয় উল্লেখ:

যমুনা দেবী তার ভাই যমরাজকে এই দিনে তিলক দিয়ে আতিথ্য করেন। এই থেকে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার প্রচলন হয়েছে।

৫. রাস পূর্ণিমা

কার্তিক পূর্ণিমার রাত্রিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রজের গোপীদের সাথে রাসলীলা করেছিলেন। এই পূর্ণিমা রাসযাত্রা বা রাসপূর্ণিমা নামে পরিচিত।

ভাগবত পুরাণে উল্লেখ আছে:

"ভগবান্ অপি তা রাত্রীঃ শারদোৎফুল্লমল্লিকাঃ।
বীক্ষ্য রন্তুং মনশ্চক্রে যোগমায়ামুপাশ্রিতঃ॥"

অর্থাৎ, শরৎকালের সেই রাত্রিগুলিতে প্রস্ফুটিত মল্লিকা ফুল দেখে ভগবান যোগমায়া আশ্রয় করে রমণ করার সংকল্প করলেন।

৬. দেবদীপাবলি বা দেবদীপাবলী

কার্তিক পূর্ণিমার দিনে কাশী (বারাণসী) এবং অন্যান্য তীর্থস্থানে দেবদীপাবলি উদযাপিত হয়। এই দিনে দেবতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন বলে বিশ্বাস করা হয় এবং ঘাটে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো হয়।

৭. কার্তিক স্নান

সমগ্র কার্তিক মাস জুড়ে প্রাতঃকালে নদী, সরোবর বা পবিত্র তীর্থে স্নান করার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে:

"কার্তিকে চ বিশেষেণ স্নানং কুর্যাদ্দিনে দিনে।
গঙ্গাস্নানফলং তস্য কোটিগুণমুদাহৃতম্॥"

অর্থাৎ, কার্তিক মাসে প্রতিদিন স্নান করলে তার ফল কোটিগুণ গঙ্গাস্নানের ফলের সমান।

৮. প্রদোষ ব্রত

কার্তিক মাসের প্রদোষ ব্রত বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ। ত্রয়োদশী তিথিতে সন্ধ্যাকালে ভগবান শিবের পূজা করা হয়।

কার্তিক মাসের দান মাহাত্ম্য

দীপদান

কার্তিক মাসে দীপদানের বিশেষ মাহাত্ম্য শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে।

পদ্মপুরাণে উল্লিখিত:

"এক দীপ প্রদানেন যত্পুণ্যং সমুপার্জিতম্।
তত্পুণ্যং জায়তে নৃণাং কার্তিকে দশগুণিতম্॥"

অর্থাৎ, সাধারণ সময়ে একটি দীপদানে যে পুণ্য হয়, কার্তিক মাসে সেই পুণ্যের দশগুণ হয়।

দীপদানের স্থান:

  • তুলসীর গাছের কাছে
  • মন্দিরে
  • পীপল গাছের নিচে
  • নদীতীরে
  • তীর্থস্থানে
  • গোশালায়

অন্নদান

কার্তিক মাসে অন্নদানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

"অন্নদানং পরং দানং সর্বদানেষু ভারত।
অন্নেন ধার্যতে সর্বং জগদেতচ্চরাচরম্॥"

অর্থাৎ, হে ভারত, অন্নদান সকল দানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অন্ন দ্বারাই এই সমগ্র চরাচর জগৎ ধারিত হয়।

বস্ত্রদান

শীতকাল আসন্ন বলে কার্তিক মাসে বস্ত্রদান বিশেষ পুণ্যদায়ক।

গোদান

"গাবোহি ভগবান্ সাক্ষাত্ সর্বদেবময়স্তথা।
তস্মাদ্গোদানমাত্রেণ সর্বদেবার্চনং ভবেত্॥"

অর্থাৎ, গোরু সাক্ষাৎ ভগবান এবং সর্বদেবময়। তাই গোদান করলে সকল দেবতার পূজা হয়।

কার্তিক মাসের বিশেষ তিথি ও উৎসব

১. কালীপূজা ও দীপাবলি (কার্তিক কৃষ্ণা অমাবস্যা)

এই দিনে দেবী কালীর পূজা এবং লক্ষ্মীপূজা করা হয়। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদযাপন করা হয়।

শাস্ত্রীয় তাৎপর্য:

এই দিনে ভগবান শ্রীরাম চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষ করে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। অযোধ্যাবাসীরা প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁর স্বাগত করেন।

২. দেবোত্থান একাদশী (কার্তিক শুক্লা একাদশী)

চার মাসের জন্য শয়ন করা ভগবান বিষ্ণু এই দিনে জাগ্রত হন। এই কারণে এই একাদশী "দেবোত্থান" বা "প্রবোধিনী" একাদশী নামে পরিচিত।

"উত্তিষ্ঠোত্তিষ্ঠ গোবিন্দ ত্যজ নিদ্রাং জগত্পতে।
ত্বয়ি সুপ্তে জগন্নাথ জগত্ সুপ্তমেব হি॥"

অর্থাৎ, হে গোবিন্দ, হে জগৎপতি, উত্থান করুন, নিদ্রা ত্যাগ করুন। আপনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন, হে জগন্নাথ, তখন সমগ্র জগৎ ঘুমিয়ে থাকে।

৩. গুরু নানক জয়ন্তী

কার্তিক পূর্ণিমাতে শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের জন্মজয়ন্তী পালিত হয়।

কার্তিক মাসের ব্রত নিয়ম

উপবাস পালন

কার্তিক মাসে বিভিন্ন ধরনের উপবাস পালন করা যায়:

  1. সম্পূর্ণ উপবাস - জল ও খাদ্য উভয় পরিত্যাগ
  2. ফলাহার - শুধু ফল ও দুধ গ্রহণ
  3. হবিষ্যান্ন - লবণ ও মশলাবিহীন নিরামিষ খাদ্য
  4. একবেলা আহার - দিনে একবার মাত্র খাদ্য গ্রহণ

পালনীয় নিয়মাবলী

  1. প্রাতঃকালে ব্রহ্মমুহূর্তে জাগরণ
  2. স্নান ও শৌচ
  3. দেবপূজা
  4. শাস্ত্রপাঠ বা শ্রবণ
  5. সত্যভাষণ
  6. মিতভাষণ
  7. ইন্দ্রিয় সংযম
  8. দান
  9. তীর্থস্নান (সম্ভব হলে)
  10. সন্ধ্যাকালে দীপদান

বর্জনীয় বিষয়

  1. মিথ্যাভাষণ
  2. নিন্দা ও অপবাদ
  3. ক্রোধ
  4. লোভ
  5. কামনা-বাসনা
  6. তামসিক খাদ্য
  7. দিবানিদ্রা
  8. অপরের অনিষ্ট চিন্তা

কার্তিক মাসের বিশেষ স্তোত্র ও মন্ত্র

দামোদর স্তোত্র

"নমো দেবদেবায় হরয়ে পরব্রহ্মণে।
সর্বপাপহারায় পরমং পবিত্রায়॥
নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥"

কার্তিক মাহাত্ম্য স্তোত্র

"কার্তিকঃ পুণ্যনামা চ সর্বপাপপ্রণাশনঃ।
দামোদরব্রতোপেতো বিষ্ণুভক্তিপ্রদায়কঃ॥
তুলসীদীপদানেন হরিপূজাফলপ্রদঃ।
সর্বকামফলঃ শ্রীমান্ মোক্ষদঃ পুরুষোত্তমঃ॥"

তুলসী প্রণাম মন্ত্র

"যন্মূলে সর্বতীর্থানি যন্মধ্যে সর্বদেবতাঃ।
যদগ্রে সর্ববেদাশ্চ তুলসীং ত্বাং নমাম্যহম্॥"

অর্থাৎ, যার মূলে সমস্ত তীর্থ, যার মধ্যভাগে সকল দেবতা এবং যার অগ্রভাগে সমস্ত বেদ, সেই তুলসী, তোমাকে আমি প্রণাম করি।

শালগ্রাম প্রণাম

"শালগ্রাম শিলা দেবী তুলসীকান্তসংশ্রয়া।
ক্ষেত্রে গণ্ডকী সংভূতা নারায়ণহৃদয়স্থিতা॥"

কার্তিক মাসের ব্রত ফল

ইহলৌকিক ফল

  1. ধন-সম্পদ - লক্ষ্মী প্রসন্ন হন
  2. সুস্বাস্থ্য - রোগমুক্তি ঘটে
  3. পারিবারিক সুখ - পরিবারে শান্তি বিরাজ করে
  4. সন্তান প্রাপ্তি - নিঃসন্তানদের সন্তান লাভ হয়
  5. বিবাহযোগ - অবিবাহিতদের বিবাহ হয়
  6. শত্রুনাশ - শত্রুদের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়

পারলৌকিক ফল

  1. পাপমোচন - সমস্ত পাপ ধৌত হয়
  2. পুণ্য লাভ - অজস্র পুণ্য অর্জিত হয়
  3. স্বর্গপ্রাপ্তি - মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে গমন
  4. মোক্ষলাভ - জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি
  5. ভগবদ্দর্শন - ভগবানের সাক্ষাৎকার

পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে:

"কার্তিকব্রতমাস্থায় যে নরা দ্বিজসত্তমাঃ।
তে যান্তি পরমং স্থানং যত্র দেবো জনার্দনঃ॥"

অর্থাৎ, হে শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, যেসব মানুষ কার্তিক ব্রত পালন করেন, তারা সেই পরম স্থানে যান যেখানে দেব জনার্দন (বিষ্ণু) অবস্থান করেন।

কার্তিক মাসের বিশেষ নির্দেশনা

মহিলাদের জন্য

কার্তিক মাসে মহিলারা বিশেষভাবে লক্ষ্মী পূজা, তুলসী সেবা ও ব্রত পালন করেন। তারা সৌভাগ্য ও পরিবারের মঙ্গলের জন্য এই ব্রত করেন।

শিশুদের জন্য

শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকে দীপদান, তুলসী প্রদক্ষিণ প্রভৃতি শেখানো উচিত। এতে তাদের মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে।

বয়স্কদের জন্য

বয়স্ক ব্যক্তিরা কার্তিক মাসে বিশেষভাবে জপ, ধ্যান ও শাস্ত্রপাঠে মনোনিবেশ করতে পারেন।

রোগীদের জন্য

যারা শারীরিকভাবে দুর্বল বা রোগাক্রান্ত, তারা সাধ্যমত ব্রত পালন করতে পারেন। ভক্তি ও সততাই প্রধান, কঠোর নিয়ম নয়।

কার্তিক মাসের আরাধনা পদ্ধতি

প্রাতঃকালীন নিয়ম

  1. ব্রহ্মমুহূর্তে (সূর্যোদয়ের দেড় ঘণ্টা আগে) জাগরণ
  2. শৌচাদি সম্পন্ন করা
  3. স্নান (ঠাণ্ডা জলে যদি সম্ভব হয়)
  4. শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান
  5. পূজাগৃহ বা তুলসীমঞ্চে গমন
  6. তুলসীতে জল ও দীপদান
  7. ভগবানের পূজা
  8. মন্ত্রজপ বা স্তোত্রপাঠ

সন্ধ্যাকালীন নিয়ম

  1. সন্ধ্যাবন্দনা
  2. তুলসীতে দীপদান
  3. আরতি ও ভজন
  4. প্রসাদ গ্রহণ
  5. ধ্যান বা শাস্ত্রপাঠ

নিত্যপাঠ্য মন্ত্র

"ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়"

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে॥"

"ওঁ নমো নারায়ণায়"

কার্তিক সমাপন

কার্তিক মাসের শেষ দিন বিশেষ পূজা ও দান করা উচিত। ব্রাহ্মণভোজন, গোদান, বস্ত্রদান করলে বিশেষ পুণ্য হয়।

সমাপন মন্ত্র:

"কার্তিক মাস মহাপুণ্যো যদ্কৃতং তন্ময়া প্রভো।
তৎসর্বং সম্পূর্ণং স্যাদ্ভগবন্তর্পণায় তে॥"

অর্থাৎ, হে প্রভু, কার্তিক মহাপুণ্য মাসে আমি যা কিছু করেছি, তা সব সম্পূর্ণ হোক আপনার তৃপ্তির জন্য।

উপসংহার

কার্তিক মাস শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, এটি আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গভীর অভিজ্ঞতা। এই মাসে পূজা, ব্রত, দান ও তপস্যার মাধ্যমে আমরা আমাদের অন্তরাত্মাকে শুদ্ধ করি এবং ভগবানের নিকটবর্তী হই।

আধুনিক যুগে আমরা যখন জীবনের নানা জটিলতায় আবদ্ধ, তখন কার্তিক মাসের শিক্ষা আমাদের জীবনে শান্তি, সংযম ও আধ্যাত্মিকতা ফিরিয়ে আনতে পারে। এই মাসের বিভিন্ন উৎসব ও ব্রত আমাদের পরিবার, সমাজ ও পরিবেশের সাথে সংযুক্ত করে।

শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে কার্তিক মাসে যেকোনো ভাল কাজ করলে তার ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই আসুন, আমরা এই পবিত্র মাসে সাধ্যমত পূজা-অর্চনা, দান-ধ্যান করি এবং আমাদের জীবনকে পবিত্র ও সার্থক করে তুলি।

শেষ প্রার্থনা:

"কার্তিকে কৃতং কর্ম ব্রতং দানং তপঃ ক্রিয়াঃ।
তৎসর্বং ফলদং দেব পরত্রেহ চ শাশ্বতম্॥
সর্বেষাং মঙ্গলং ভূয়াৎ সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু।
সর্বে শান্তিমবাপ্নুয়ুঃ মা কশ্চিদ্দুঃখভাগ্ভবেৎ॥"

অর্থাৎ, হে দেব, কার্তিক মাসে যে সকল কর্ম, ব্রত, দান, তপস্যা ও ক্রিয়া করা হয়েছে, তা সব ইহলোক ও পরলোকে চিরকাল ফলপ্রদ হোক। সকলের মঙ্গল হোক, সকলে কল্যাণ দেখুক, সকলে শান্তি লাভ করুক এবং কেউ দুঃখভোগ না করুক।

হরি ওঁ তৎসৎ। জয় শ্রীকৃষ্ণ।


গ্রন্থপঞ্জি:

  1. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ
  2. পদ্মপুরাণ
  3. স্কন্দপুরাণ
  4. ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ
  5. ভগবদ্গীতা
  6. কাশীখণ্ড
  7. বিভিন্ন স্তোত্র ও ধর্মগ্রন্থ

লেখকের টীকা: এই ব্লগ পোস্টটি বিভিন্ন পৌরাণিক শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থের উপর ভিত্তি করে রচিত। পাঠকদের নিজ নিজ সাধ্য ও শ্রদ্ধা অনুযায়ী ব্রত ও পূজা পালন করার পরামর্শ দেওয়া হল। শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়ে কার্তিক মাসের প্রকৃত ফল লাভ করা সম্ভব।

Post a Comment